
৩৬ রানে ১, ৩৬ রানে ২। কিছুক্ষণ বিরতি, বলের হিসেবে ৩ ওভার। তারপর ৪৫ রানে ৩। ৪৫ রানে ৪। আবার বিরতি। এবারও ঠিক ৩ ওভার। তারপর আবার জোড়া আঘাত। ৬২ রানে ৫। ৬২ রানে ৬। ম্যাচ জুড়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস যেন ঘোষণা দিতে চাইল— 'আমরা যখন শিকার করি, একসঙ্গে দুটো করেই করি'।
কুমিল্লার সবচেয়ে বড় শিকার অবশ্য টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ‘বড় দল’ রংপুর রাইডার্স। খেলোয়াড়দের নিলামের পর রংপুরকে ধরা হচ্ছিল সবচেয়ে ফেবারিট। আর কোন দলটিকে নিয়ে সবচেয়ে কম আশা করা হয়েছিল? উত্তরটা সবার জানা। খোদ কুমিল্লা ফ্র্যাঞ্চাইজিও যেন হাল ছেড়ে বসেছিল লড়াইয়ে নামার আগেই। সেই সবচেয়ে ‘ফেবারিট’ রংপুরকে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়ে সবার আগে ফাইনালে নাম লেখাল মাশরাফি বিন মুর্তজা নামের এক আশ্চর্য পরশপাথরের ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া কুমিল্লা।
সেই জয়টিও ৭২ রানের বড় ব্যবধানে, যেন কুমিল্লা ১৫ ডিসেম্বর ফাইনালের ট্রফি মঞ্চটার ছবিও এঁকে দিয়ে রাখতে চাইল এখনই! কুমিল্লার তোলা ৭ উইকেটে ১৬৩ রানের জবাবে মাত্র ৯১ রানে অলআউট রংপুর।
অথচ টুর্নামেন্টে এই দুই দলেরই যাত্রা শুরু হয়েছিল বিপরীতমুখী। জয় দিয়ে শুরু রংপুরের, কুমিল্লা হেরেছে যাচ্ছেতাইভাবে। কিন্তু টুর্নামেন্ট যত গড়িয়েছে, ততই প্রথম ম্যাচটাকে বরং 'ফ্লুক' মনে করিয়ে দিচ্ছিল কুমিল্লা। গ্রুপপর্ব শেষ করেছে তারা সবার ওপরে থেকেই। টুর্নামেন্টের নিয়মানুযায়ী আজ প্রথম কোয়ালিফায়ারে মুখোমুখি হয়েছিল দ্বিতীয় স্থানে থেকে গ্রুপপর্ব শেষ করা রংপুরের সঙ্গে। তাতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় জুড়ে আধিপত্য করে গেল কুমিল্লা।
টসে জিতে বোলিং নেওয়ার সময় রংপুর অধিনায়ক বলেছিলেন, 'আমরা চেজ করতে চাই।' দলের ব্যাটিংয়ের জোর দেখে মনে হচ্ছিল সাকিবের সিদ্ধান্তটা বেশ ভালোই হয়েছে। তবে আসল জায়গায় এসে, কাগজে-কলমের শক্তিটাকে মাঠে অনূদিত আর করতে পারল না তারা। একপ্রকার আত্মসমর্পণই করল আবু হায়দার-আসহার জাইদিদের কাছে। এই টুর্নামেন্ট থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এই আবু হায়দার। ১৯ বছরের এই তরুণ বাঁহাতি বোলার এবারের বিপিএলের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। তাঁর উইকেট সংখ্যা ২১টি। গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে শুধু চিটাগং ভাইকিংসের ব্যাটসম্যানরাই বেঁচে গেছেন। সেই ম্যাচটি ছাড়া এ পর্যন্ত ১১ ম্যাচের ১০টিতেই উইকেট নিয়েছেন—এতটাই ধারাবাহিক ছিলেন এই পেসার।
উইকেটশিকারির তালিকায় নাম লেখালেন আজকের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও। পঞ্চম ওভারে রংপুরের ওপর প্রথম 'জোড়া' আঘাত এনেছিলেন তিনিই। সেখান থেকেই আর ঘুরে দাঁড়াতে পারল না রংপুর। ৩ উইকেটে ৪৫ রান হারানোর পর সাকিব ব্যাট হাতে নেমে প্রথম বলেই আউট হয়েছেন। গোল্ডেন ডাক নিয়ে সাজঘরে যখন ফিরছিলেন রংপুর অধিনায়ক, সেখানেই শেষ হয়ে গেছে ম্যাচে রংপুরের ফেরার আশাও। লেন্ডল সিমন্সই যা একটু রান করলেন, ২৫ রান করেছেন এই ওপেনার। রংপুরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২ মোহাম্মদ নবীর ব্যাটে।
এর আগে ইমরুল কায়েসের ৪৮ বলে ৬৭ আর আসহার জাইদির ১৫ বলে তোলা ৪০ রানের ঝোড়ো ইনিংসের সৌজন্যে বেশ ভালো পুঁজি পায় কুমিল্লা। জাইদি পরে মাত্র ১১ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচটা রীতিমতো একার করে নিয়েছেন। কিন্তু মাশরাফিকে ভুলবেন কী করে? ব্যাটিং-বোলিং থেকে নিজেকে এক রকম ‘অবসরে’ পাঠানো অধিনায়ক আজ নামলেন ওয়ান ডাউনে। ৫ বলে ১। তারপরও মাশরাফিকে ‘ব্যর্থ’ বলতে দ্বিধা হবেই। সবচেয়ে চওড়া হাসিটা এখন পর্যন্ত যে তাঁরই!