মুস্তাফিজই হবে বাংলাদেশের পরবর্তী সুপারস্টার


আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেও দুদণ্ড অবসর নেই কুমার সাঙ্গাকারার। বিপিএলে আসার আগে যুক্তরাষ্ট্রে খেলে এসেছেন অলস্টার টুর্নামেন্টে, সামনে আরব আমিরাতে মাস্টার্স চ্যাম্পিয়নস লিগেও খেলবেন শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক। গত পরশু সকালে ব্যস্ততম সাবেক ক্রিকেটার সাঙ্গাকারাকে পাওয়া গেল ঢাকা ডিনামাইটসের টিম হোটেলে, লম্বা আলাপে সামীউর রহমান শুনেছেন তাঁর আরো অনেক গল্পও।
প্রশ্ন : বিপিএলের আগের দুটো আসরের গায়ে লেগে অনেক বিতর্ক। তা এবার এই টুর্নামেন্টে খেলার প্রস্তাব পেয়ে কী চিন্তা করেছিলেন?

কুমার সাঙ্গাকারা : দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বিপিএলের আগের আসরগুলোতে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এ রকমটা যখন হয়, তখন যেকোনো আসরই এর গ্রহণযোগ্যতা হারায়। অংশ নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে ভালো খেলোয়াড়রাও। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিতরা খেলতে আসার আগে অনেক কিছুই ভেবে দেখে। আমিও সিদ্ধান্ত নিতে লম্বা সময় ধরেই ভেবেছি। এরপর ভাবলাম চন্দিকা হাতুরাসিংহে এখানে কোচিং করাচ্ছেন, বাংলাদেশও বছর দেড়েক ধরে বেশ ভালো করছে—সব কিছু মিলিয়ে একটা ইতিবাচক সংকেত পাচ্ছিলাম। আসার পর অবশ্য আমার সব শঙ্কাই দূর হয়ে গেছে।



প্রশ্ন : তা এখানে আসার আগে সবার আগে কোন স্মৃতিটা ফিরে এসেছিল?

সাঙ্গাকারা : হা-হা-হা! কিছুদিন আগেই টুইট করেছিলাম, ঢাকা বদলে গেছে; কিন্তু ঢাকার যানজট আগের মতোই আছে। আসলে এর আগেও অনেকবার এ শহরে এসেছি; কিন্তু এবার একেবারে অন্য রূপে ধরা দিয়েছে আমার চোখে। অনেক কিছু দেখেছি, নতুন নতুন অনেক খাবারও চেখে দেখেছি। কিছু জায়গায় গিয়ে তো মনে হয়েছে, পৃথিবীর যেকোনো বড় শহরের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো অবস্থায় চলে গেছে ঢাকা।

প্রশ্ন : মুস্তাফিজকে কেমন দেখলেন, তাঁকে কি রহস্য বোলার মনে হয় আপনার?

সাঙ্গাকারা : রহস্য বোলার বলব না, তবে সে খুবই ভালো বোলার। ওর বলে বৈচিত্র্য অনেক, মানসিক গঠনটাও খুব পরিপক্ব। এ রকম বোলার খুব কমই আসে। শেখার আগ্রহ আছে, প্রতিনিয়তই শিখছে এবং উন্নতিও করছে। বাংলাদেশ দলে ওর অন্তর্ভুক্তি দলটিকে আরো শক্তিশালী করেছে। সব বিদেশি ক্রিকেটারই বলছে, মুস্তাফিজ দারুণ এক চমক। দু-তিন বছরের মাথায় ও-ই হবে বাংলাদেশের পরবর্তী সুপারস্টার।

প্রশ্ন : নেটে তাঁকে খেলে কী বুঝলেন?

সাঙ্গাকারা : ওকে সামলানো সত্যিই খুব মুশকিল। মুস্তাফিজের বৈচিত্র্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেশ খানিকটা সময় লাগে। ব্যাটসম্যান যখন ওর বোলিংয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যাবে, তখন ভালো করতে গেলে ওকে আরো ভিন্নতা আনতে হবে। এখন যেমন দলের জন্য সে একটা সম্পদ, দু-তিন বছর পর সেটা ধরে রাখতে গেলে ওকে বোলিং বৈচিত্র্য আরো বাড়াতে হবে।

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রে শচীন আর ওয়ার্নের টুর্নামেন্টে খেললেন, বিপিএলে খেলছেন, সামনে মধ্যপ্রাচ্যে এমসিএলেও আপনাকে দেখা যাবে। সব মিলিয়ে আপনাকে তো ব্যস্ততম সাবেক ক্রিকেটার বলেই মনে হচ্ছে?

সাঙ্গাকারা : হা-হা-হা, আমার তো মনে হচ্ছে সব সাবেক ক্রিকেটারই এখন ব্যস্ত! দেখুন বছর তিনেক আগেও একজন ক্রিকেটারের জন্য অবসর নেওয়া মানেই ছিল সব কিছু শেষ। তাকে তখন অন্য কিছু করতে হতো। কিন্তু এখন, অবসর নেওয়ার পরও ক্রিকেট খেলার অনেক সুযোগ। আমি খুব সৌভাগ্যবান যে অবসর নেওয়ার পরপরই এতগুলো বিকল্প সামনে চলে এসেছে।

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রে শচীন-ওয়ার্নের অলস্টার টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? বিশেষ করে বেসবল মাঠে ক্রিকেট খেলার ব্যাপারটি?

সাঙ্গাকারা : ওহ! অসাধারণ অভিজ্ঞতা। নতুন তো বটেই, তবে খুব মজা হয়েছে। প্রচুর লোক হয়েছিল মাঠে। অবসর নেওয়া সব কিংবদন্তির সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করা, অনেক পুরনো গল্প করা—সব মিলিয়ে দারুণ একটা অভিজ্ঞতা।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্যের পর অনেক গণমাধ্যমেই তাদের তুলনাটা চলছে ১৯৯৬-এর বিশ্বকাপজয়ী শ্রীলঙ্কার সঙ্গে। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

সাঙ্গাকারা : বাংলাদেশ উন্নতির পথেই আছে। তবে সেসময় আমাদের দলটা ছিল সবচেয়ে অভিজ্ঞ ওয়ানডে দল। তা ছাড়া ওয়ানডেতে বিশ্বের সেরা কয়েকজন ক্রিকেটারও ছিল আমাদের দলে। উইকেট, টুর্নামেন্টের নিয়ম—সব কিছুই আমাদের পক্ষে ছিল। সেসময় ২২০ রানের পুঁজি নিয়েও লড়াই করে জেতা যেত। কিন্তু এখন নিয়ম বদলেছে, মানসিকতা বদলেছে। আগে উপমহাদেশের বাইরের ক্রিকেটাররা স্পিন এতটা ভালো খেলত না। আর এখন ওরা দিব্যি সুইপ কিংবা রিভার্স সুইপ মারছে। তাই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা হয়তো একটু কঠিনই হবে, তবে তাদেরও দারুণ সুযোগ আছে।

প্রশ্ন : ২০১৪-তে যেমন দেখে গিয়েছিলেন, সেই তুলনায় তো অনেক উন্নতি করেছে, তাই না?

সাঙ্গাকারা : হ্যাঁ, সেখান থেকে অনেক উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। চন্দিকা হাতুরাসিংহে ভালো করেই জানেন একটা দলের উন্নতির জন্য কী কী করতে হয়। তিনি বুদ্ধিমান কোচ, তাঁর প্লেয়ার ম্যানেজমেন্টও দারুণ। দলে জায়গা পাওয়ার জন্য তাঁর কাছে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি। চন্দিকা আসলে একজন খেলোয়াড়ের ভেতর ভালো করার তাগিদ জাগিয়ে দেওয়ার কাজটি খুব ভালো পারেন।

প্রশ্ন : আপনি তো ক্যান্ডির বিখ্যাত ট্রিনিটি কলেজের ছাত্র। তা সেখানে এত খেলার ভিড়ে ক্রিকেটে আগ্রহ বাড়ল কিভাবে?

সাঙ্গাকারা : আসলে ট্রিনিটি কলেজ বিখ্যাত তার রাগবি দলের জন্য। শ্রীলঙ্কার রাগবি দলের বেশির ভাগ অধিনায়কই ট্রিনিটির। শ্রীলঙ্কায় স্কুল পর্যায়ে খেলাধুলায় ট্রিনিটির হয়ে রাগবি খেলার চেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন আর কিছুই হতে পারে না। আসলে রাগবিতে পারতাম না বলেই আমি ক্রিকেটে আসি (হাসি...)।

প্রশ্ন : ‘মিনিস্ট্রি অব ক্র্যাব’ বলে আপনার আর মাহেলা জয়াবর্ধনের একটা রেস্টুরেন্ট আছে কলম্বোয়। ঢাকায় একটি শাখা খুললে কি চলবে মনে হয়?

সাঙ্গাকারা : আমরা ভাবছি রেস্টুরেন্ট ব্যবসাটা আরেকটু বড় করার। হুট করে কিছু করতে চাই না, সময়টা ভালো থাকলে সব করব। আর এবার তো ঢাকাকে নতুন করে চিনলাম, মনে হয়েছে নতুন কিছু করার জন্য শহরটা খুবই ভালো। আমার তো মনে হয় শুরু করলে ভালোই চলবে।

প্রশ্ন : একদম শেষপ্রান্তে আমরা, এবার খুবই প্রথাগত একটা প্রশ্ন। পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

সাঙ্গাকারা : এখন বাড়িতে যতটা সময় কাটাতে পারি, তার চেয়ে বেশি সময় কাটানো ছাড়া আর কী! দেশে-বিদেশে খেলার পাট চুকিয়ে আমি বাসার উঠানে আমার ছেলের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছি, পরিবারকে আরো বেশি সময় দিচ্ছি—এটাই চাইব।

সমগ্র বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক

এক্সক্লুসিভ